Home News মহাকাশ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা

মহাকাশ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী বিনিয়োগ ব্যাংক ও আর্থিক সেবাদাতা মরগ্যান স্ট্যানলির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৪০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক মহাকাশ শিল্প বার্ষিক এক লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

by Newsroom
মহাকাশ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা

মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার প্রধান বিল নেলসন বলেছেন, ‘চীনের সাথে চাঁদে ফেরার প্রতিযোগিতা করছে যুক্তরাষ্ট্র।’ খবর বিবিসির।

বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেলসন বলেন, চীনের আগে যেন আমরাই সেখানে পৌঁছাতে পারি, তা নিশ্চিত করতে চাই।

তার এ মন্তব্য ১৯৬০ ও ১৯৭০’ এর দশকের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়; যখন যুক্তরাষ্ট্র তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে তীব্র মহাকাশ প্রতিযগিতায় লিপ্ত হয়েছিল। তারই ফলস্বরূপ; চাঁদের বুকে প্রথম মহাকাশচারী পাঠাতেও সক্ষম হয় দেশটি।

এরপর বিশ্ব রাজনীতিতে ঘটেছে আমূল পরিবর্তন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গেছে, চন্দ্র অভিযানের উৎসাহেও ক্রমে ভাটা পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের।

কিন্তু, গত দুই দশকে চীন নতুন বিশ্বশক্তি হিসেবে উদয় হওয়ার পর মহাকাশ প্রতিযোগিতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন মাত্রা পাচ্ছে। এবার অবশ্য, যুক্তরাষ্ট্র শুধু সরকারিভাবেই নয়, বরং বেসরকারি খাতকেও যুক্ত করছে এই প্রতিযোগিতায়। যেমন নাসা বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে অভিযানের অধিকাংশ প্রস্তুতির কাজে নিয়োজিত করছে।

বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার বিষয়ে নেলসন জানান, এটা খুবই দরকারি, কারণ এ ধরনের পার্টনারশিপের মাধ্যমে বিপুল খরচ ভাগাভাগি করে নেওয়া যায়। এভাবে বেসরকারি মহাকাশ উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে পারছে নাসা।

চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণের যান (লুনার ল্যান্ডার) তৈরির জন্য ২০২১ সালে ধনকুবের ইলন মাস্কের বাণিজ্যিক মহাকাশ সংস্থা- স্পেসএক্স’কে ৩০০ কোটি ডলারের একটি ঠিকাদারি দেয় নাসা। স্পেসএক্স ইতোমধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট তৈরি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি খাতের অন্যান্য কোম্পানিও মহাকাশ প্রতিযোগিতার সুফল পাচ্ছে। এবছরের শুরুতে আরেক ধনকুবের জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিন সংস্থার সাথে ৩.৪ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করে নাসা। এবারেও চন্দ্রযান তৈরির জন্যই চুক্তিটি হয়। তবে ব্লু অরিজিনের তৈরি চন্দ্রযান পরবর্তী অভিযানগুলোয় ব্যবহৃত হবে।

মহাকাশ অভিযানে মার্কিন সরকার শত শত কোটি ডলার বরাদ্দ দিচ্ছে। এই দুটি কোম্পানির বাইরেও অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠান তার সুবিধা পাচ্ছে। এই অর্থ ব্যয় হচ্ছে, চীনের থেকে এগিয়ে থাকতে। বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতি- যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সবদিক দিয়েই যে উত্তেজনা ও প্রতিযোগিতা চলছে– তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টায়।

এদিকে গত আগস্ট মাসে চতুর্থ দেশ হিসেবে চাঁদের বুকে চন্দ্রযান অবতরণে সফল হয় ভারত। একইসঙ্গে, এ অভিযানে প্রথমবারের মতো চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে যায় কোনো চন্দ্রযান।

ভারতের এই সাফল্য সত্ত্বেও – সেদিকে ততোটা মনোযোগ নেই নাসার। তাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চীনের মহাকাশ কর্মসূচি, এর ওপর তারা ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে।

কারণ, চীনই বিশ্বের একমাত্র দেশ- যাদের নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন রয়েছে। ইতোমধ্যেই চীন চাঁদের মাটির নমুনা এনেছে পৃথিবীতে। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছানোর পরিকল্পনাও আছে দেশটির।

নাসার প্রধান বিল নেলসন এবিষয়ে তার উদ্বেগ তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পানির সন্ধান পেয়েছি, আমাদের আগে চীন গিয়ে যদি ওই অঞ্চলকে নিজেদের বলে দাবি করে, যদি বলে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে যেতে পারবে না’ – এটাই আমার মূল আশঙ্কা।

চীন এরমধ্যেই পৃথিবীতে এমন কাজ করেছে। নেলসন বলেন, দেশটি দক্ষিণ চীন সাগরের কিছু এলাকায় কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে সেখানে নিজেদের সার্বভৌমত্ব দাবি করছে। এছাড়া, চীন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আর্টেমিস অ্যাকর্ডস’ নামক চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশও নয়। এই চুক্তির আওতায়, মহাকাশ ও চাঁদে অভিযানের বিষয়ে সর্বোত্তম চর্চার একটি রূপকাঠামো আছে।

এদিকে চীন সরকার বলেছে, মহাকাশে শান্তিপূর্ণভাবে অনুসন্ধানে চালিয়ে যেতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর আগে বিভিন্ন সময় যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে করা সমালোচনাকে নাকচ করেছে বেইজিং। এগুলোকে তারা চীনের স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত মহাকাশ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কুৎসা রটনার তৎপরতা’ বলে নিন্দা জানিয়েছে।

এই প্রতিযোগিতার কারণে নাসা বিপুল বিনিয়োগ পাচ্ছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে সংস্থাটি ৭১.২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার কথা জানায় – যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১০.৭ শতাংশ বেশি ছিল।

স্পেসএক্স, ব্লু অরিজিনের মতো বড় বেসরকারি সংস্থাকে নাসা কার্যাদেশ দিলে, সহজেই তা গণমাধ্যমের সংবাদ শিরোনাম হয়। কিন্তু, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির আরও গভীরে অবদান রাখছে নাসার বর্ধিত ব্যয়।

নেলসন বলেন, ‘আমাদের ব্যয়ের চারভাগের একভাগ পাচ্ছে ছোট ব্যবসাগুলো।’

নাসার সাবেক প্রকৌশলী ও হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের মহাকাশ অর্থনীতিবিদ সিনেড ও’সুলিভান জানান, এই অর্থ ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশকে গতিশীল করছে। সরকার মহাকাশ প্রযুক্তির নবউদ্যোগগুলোর জন্য প্রথম গ্রাহক হচ্ছে, সরকারি (নাসার) চুক্তি পাওয়ায় তারা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের দ্বারস্থ হতে পারছে এবং আরও পুঁজি সংগ্রহ করতে পারছে।

‘(এসব প্রতিষ্ঠানের) উদ্যোক্তা বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ পাওয়া নিয়ে আমরা প্রায়ই কথা বলে থাকি, তবে সরকারি কাজের চুক্তি পাওয়াটাও তাদের জন্য সমান গুরুত্বের, অথবা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

যুক্তরাষ্ট্রের ফের চন্দ্রাভিযান একটি বৃহৎ প্রকল্প, কিন্তু এর ফলে মহাকাশ-ভিত্তিক অন্যান্য কার্যক্রমও নবগতি লাভ করেছে, যেগুলো আরও লাভজনক হতে পারে।

১৯৫৭ সালে প্রথম দেশ হিসেবে পৃথিবীর কক্ষপথে স্যাটেলাইট প্রেরণ করে রাশিয়া (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন)। সেসময় তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইতিহাসের প্রথম মহাকাশ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। বর্তমানে পৃথিবীর কক্ষপথে সাড়ে ১০ হাজারের বেশি স্যাটেলাইট রয়েছে বলে জানাচ্ছে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি।

গত এক দশকে মহাকাশ শিল্পের এই বিকাশের জন্য স্পেসএক্সের মতো বৃহৎ সংস্থাকে কৃতিত্ব দিয়েছেন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান স্পেস ক্যাপিটালের প্রতিষ্ঠাতা চ্যাড এন্ডারসন।

তার মতে, ‘স্পেসএক্সের কারণেই আজকে আমরা মহাকাশকে বিনিয়োগের একটি খাত হিসেবে আলোচনা করতে পারছি। অথচ বাণিজ্যিকভাবে প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পূর্বে, অর্থাৎ ১০ বছরের কিছুটা বেশি সময় আগে, এই বাজারের পুরোটাই সরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণ করতো।’

স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে বেসরকারি খাত এগিয়ে যাওয়ার পেছনে প্রধানত দুটি কোম্পানি– ওয়ান ওয়েব ও স্টার লিংক অবদান রেখেছে।

এন্ডারসনের ব্যাখ্যা করেন, ‘রকেট ও স্যাটেলাইট নির্মাণের চেয়েও অনেক বড় মহাকাশ অর্থনীতি। অদৃশ্য এই মেরুদণ্ড বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।’

মহাকাশে স্যাটেলাইটের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে তাদের প্রদত্ত তথ্য ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এসব তথ্য ব্যবহার হচ্ছে কৃষি, বিমা, নৌশিল্প-সহ অজস্র খাতে।

মহাকাশ অর্থনীতির আরেক বড় খেলোয়াড় নিউজিল্যান্ড-ভিত্তিক রকেটল্যাব।

স্পেসএক্সের এই প্রতিযোগী কোম্পানি ইতোমধ্যেই তার গ্রাহকদের হয়ে ৪০টি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে। এই গ্রাহকদের তালিকায় নাসা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য সরকারি সংস্থাও রয়েছে।

রকেটল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা- পিটার বেক সামান্য ডিশওয়াশার ইঞ্জিনিয়ার থেকে মহাকাশে রকেট প্রেরক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারে পরিণত হয়েছেন। তার মতে, পৃথিবীর বাইরের যে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে – আমরা তার সামান্য অংশই কাজে লাগাতে পেরেছি এপর্যন্ত।

পিটার বেক বলেন, ‘শুধুমাত্র উৎক্ষেপণে ১০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা। তাছাড়া, অবকাঠামো, স্যাটেলাইট নির্মাণে আছে ৩০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা। অ্যাপ্লিকেশনস খাতে আছে ৮৩০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা।’

শুধুমাত্র পিটার বেক-ই বড় সম্ভাবনা থাকার দাবি করছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী বিনিয়োগ ব্যাংক ও আর্থিক সেবাদাতা মরগ্যান স্ট্যানলির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৪০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক মহাকাশ শিল্প বার্ষিক এক লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে।’

এই অবস্থায়, মহাকাশ সংস্থাগুলোর জন্য সামনে আর কী সম্ভাবনা আছে?

চাঁদের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, বিশেষত সেখানে খনি কার্যক্রম নিয়ে কিছুটা সতর্ক মনোভাব পোষণ করেন পিটার বেক।

তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে চাঁদে যাওয়া, সেখানে খনি পরিচালনা ও পৃথিবীতে সেসব খনিজ উপাদান নিয়ে আসা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়।’

নাসার বিল নেলসন বলেন, সম্ভাবনা আছে চিকিৎসা গবেষণায়। ২০১৯ সালে ওষুধ কোম্পানি মার্ক আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে একটি গবেষণা করেছিল, যা তাদের ক্যানসারের একটি ট্রিটমেন্ট তৈরির কাজে লেগেছে।

তাছাড়া, মহাকাশের শূন্য মধ্যাকর্ষণ পরিবেশে ফাইবার অপটিক আরও কার্যকরীভাবে উৎপাদন করা যাবে বলে জানান তিনি।

নেলসন বলেন, ‘একপর্যায়ে আমরা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে অনেক ধরনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড দেখব।’

আরও পড়ুনঃ মহাকাশে মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে ৪০ জোড়া বৃহস্পতিসদৃশ গ্রহ

Related News